এনআরবি লাইফ

যাকাত না দেওয়ার পরিণাম ও শাস্তি

post-img

যাকাত ইসলামের স্তম্ভ ও অবশ্য পালনীয় বিধান। এ বিধান পালন না করার অর্থ আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করা। যাকাত ফরজ হওয়ার মতো সম্পদের মালিক হওয়ার পরও যারা এ বিধান পালন করবে না পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহে তাদের জন্য ইহকালীন লাঞ্ছনা-গঞ্ছনা ও পরকালীন শাস্তির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। যার সংক্ষিপ্ত আলোচনা নিম্নরূপ :

যাকাত আদায় না করার ইহকালীন শাস্তি

কোরআন ও হাদীসে যাকাত আদায় না করার ইহকালীন শাস্তির যে বর্ণনা এসেছে তা হলো, 

১. আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়া : পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, আমার রহমত সব কিছুতে পরিব্যাপ্ত। তা আমি সেই লোকদের জন্য লিখব যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, যাকাত দেয় ও আমার আয়াতসমূহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে। 

২. আল্লাহর সাহায্য থেকে বঞ্চিত হওয়া : যে ব্যক্তি আল্লাহকে সাহায্য করেন তিনি তাকে সাহায্য করেন। যাকাত প্রদান আল্লাহকে সাহায্যকারীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কোরআনে এসেছে, যে আল্লাহকে সাহায্য করবে আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন; নিঃসন্দেহে আল্লাহ শক্তিসম্পন্ন, সর্বজয়ী। তারা সেই সব লোক যাদেরকে আমি পৃথিবীতে ক্ষমতা প্রদান করলে তারা নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত প্রদান করে, সৎকাজের আদেশ দেয় ও অসৎ কাজে নিষেধ করে।  

অতএব যাকাত আদায় না করলে আল্লাহর সাহায্য থেকে বঞ্চিত হতে হয়। 

৩. নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী করে নেওয়া : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকাত দানে বিরত ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে আদিষ্ট হয়েছিলেন। ফলে যাকাত না দেওয়ার অর্থ নিজের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে নেওয়া। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অর্থ : আমি লোকজনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি যে পর্যন্ত না তারা সাক্ষ্য দিবে, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই ও মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং নামায প্রতিষ্ঠা করবে ও যাকাত আদায় করবে। যখন তারা এ কাজগুলো করবে তখন তারা আমার হাত থেকে তাদের জান-মাল রক্ষা করবে, অবশ্য তাদের চূড়ান্ত বিচারের ভার আল্লাহর উপর। 

৪. আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পৃষ্ঠপোষকতা হারানো : আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যাদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেন তাদের মধ্যে যাকাত প্রদানের গুণাবলি থাকতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, তোমাদের একমাত্র বন্ধু আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও ঈমানদারগণ যারা নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং তারা রুকুকারী। 

৫. জাতীয় বিপর্যয় : যাকাত আদায় না করার কারণে নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জাতীয় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়। হাদীসে এসেছে, যে সমাজের লোকেরা যাকাত দিতে অস্বীকার করবে আল্লাহ তাদের কঠিন ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষে নিমজ্জিত করবেন।

যে জাতি যাকাত দেয় না মহান আল্লাহ তাদের উপর বৃষ্টিপাত বন্ধ করে দেন। স্থল ও জলভাগে ধন-সম্পদ বিনষ্ট হয় শুধুমাত্র যাকাত আটকে রাখার কারণে। 

যাকাত আদায় না করার পরকালীন শাস্তি  

যাকাত দানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারীকে পরকালে কঠিন ও ভয়ংকর আজাবের মুখোমুখি হতে হবে। পবিত্র কোরআন ও হাদীসে তাদের সে আজাবের চিত্র ফুটে উঠেছে, 

১. ধন-সম্পদ আগুনে গরম করে সেঁক দেওয়া : এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, এবং যারা সোনা ও রূপা পুঞ্জিভূত করে রাখে, আর তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না, তুমি তাদের বেদনাদায়ক আজাবের সুসংবাদ দাও। যেদিন জাহান্নামের আগুনে তা গরম করা হবে, অতঃপর তা দ্বারা তাদের কপালে, পার্শ্বে এবং পিঠে সেঁক দেওয়া হবে। (আর বলা হবে) ‘এটা তা-ই যা তোমরা নিজেদের জন্য জমা করে রেখেছিলে, সুতরাং তোমরা যা জমা করেছিলে তার স্বাদ উপভোগ করো। 

২. বিষধর সাপের দংশন : মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন আর সে তার যাকাত দেয় না, কেয়ামতের দিন ঐ সম্পদকে দু’টি বিষের থলিবিশিষ্ট মাথায় টাকপড়া মারাত্মক বিষধর সর্পে পরিণত করা হবে, যা তাকে পেঁচিয়ে তার চোয়ালে আঘাত করে করে বলতে থাকবে, আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার গচ্ছিত ধন...। 

৩. কেয়ামতে বেড়ি পরানো : এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, আর আল্লাহ যাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ থেকে যা দান করেছেন তা নিয়ে যারা কৃপণতা করে, তারা যেন ধারণা না করে যে, তা তাদের জন্য কল্যাণকর। বরং তা তাদের জন্য অকল্যাণকর। যা নিয়ে তারা কৃপণতা করেছিল, কেয়ামত দিবসে তা দিয়ে তাদের বেড়ি পরানো হবে। আর আসমানসমূহ ও জমিনের উত্তরাধিকার আল্লাহরই জন্য। আর তোমরা যা আমল করো, সে ব্যাপারে আল্লাহ সম্যক জ্ঞাত। 

৪. পশু দ্বারা পদদলিত : হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি নিজের উটের হক আদায় করবে না, সে উট দুনিয়া অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হয়ে খুর দিয়ে আপন মালিককে পিষ্ট করতে আসবে, যে ব্যক্তি নিজের ছাগলের হক আদায় করবে না, সে ছাগল দুনিয়া অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হয়ে খুর দিয়ে আপন মালিককে পদদলিত করবে এবং শিং দিয়ে আঘাত করবে।... রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের কেউ যেন কেয়ামতের দিবসে কাঁধের উপর চিৎকাররত ছাগল বহন করে আমার নিকট এসে এ কথা না বলে যে, হে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। 

তখন আমি বলব, তোমাকে করার আমার কোনো ক্ষমতা নেই। আমি তো এ বিষয়টি পেঁৗঁছে দিয়েছিলাম। আর তোমাদের কেউ যেন কেয়ামতের দিবসে কাঁধের উপর চিৎকাররত উট বহন করে আমার নিকট এসে এ কথা না বলে যে, হে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমাকে শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। তখন আমি বলব, তোমার জন্য কিছু করার কোনো ক্ষমতা আমার নেই। আমি তো এ সতর্কবার্তা তোমাদেরকে (আগেই) পৌঁছে দিয়েছিলাম। 

৫. উত্তপ্ত পাথর ব্যবহার : হযরত আবু যর (রাযি.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করে বলেন, যারা সম্পদ জমা করে রাখে, তাদেরকে এমন গরম পাথরের সুসংবাদ দাও যা তাদেরকে শাস্তি প্রদানে জাহান্নামে উত্তপ্ত করা হচ্ছে। তা তাদের স্তনের বোঁটার উপর স্থাপন করা হবে আর তা কাঁধের পেশী ভেদ করে বের হবে এবং কাঁধের উপর স্থাপন করা হবে, তা নড়াচড়া করে সজোরে স্তনের বোঁটা ছেদ করে বের হবে। 

৬. আগুনের চুড়ি পরিধান : গহনার যাকাত না দিলে তার শাস্তির বর্ণনা এসেছে এভাবে, আমর ইবন শুয়াইব (রাযি.) তাঁর পিতা, তিনি তার দাদার সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, একটি মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট তার কন্যাকে নিয়ে এলেন যার হাতে ছিল দু’টি স্বর্ণের মোটা চুড়ি। তিনি বললেন, তুমি কি এটার যাকাত দাও? সে বলল, না। 

তিনি বললেন, এ দু’টির পরিবর্তে কেয়ামতের দিন আল্লাহ তোমাকে দু’টি আগুনের চুড়ি পরিধান করলে তা কি তোমাকে খুশী করবে? বর্ণনাকারী বলেন, এরপর সে চুড়ি দু’টি খুলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট রেখে বলল, এ দু’টি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য।  

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে প্রমাণিত হয়, যাকাত ইসলামের এক বাধ্যতামূলক বিধান, যা আদায় না করলে ইহকালীন অশান্তি, লাঞ্ছনা-গঞ্ছনা ও পরকালীন শাস্তি অবধারিত।

আরও পড়ুন

** যাকাত কাকে দিবেন এবং কাকে দিতে পারবেন না

সম্পর্কিত খবর

About Us

NRBC is an open news and tele video entertainment platform for non-residential Bengali network across the globe with no-business vision just to deliver news to the Bengali community.