এনআরবি লাইফ

যাকাত কাকে দিবেন এবং কাকে দিতে পারবেন না

post-img

যাকাত ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ। এ বিধান পালনে প্রয়োজন সঠিক পথ ও পন্থা। যাকাতের বণ্টন সঠিক না হলে যাকাত আদায় হবে না। পবিত্র কোরআনে আট খাতে যাকাতের অর্থ ব্যয় করার কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ পাক কোরআনে বলেন, যাকাত কেবল ফকির মিসকিন ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য, যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা উদ্দেশ্য তাদের জন্য, দাস মুক্তির জন্য, ঋণে জর্জরিত ব্যক্তিদের জন্য, আল্লাহর পথে সংগ্রামকারী এবং মুসাফিরদের জন্য। এটা আল্লাহর নির্ধারিত বিধান এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়। 

১. ফকির : যে ব্যক্তি মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ভিক্ষা চায়, যারা সর্বদা অভাব অনটনে জীবন কাটায়, নিজ জীবিকার জন্য অন্যের মুখাপেক্ষী এরাই ফকির।

২. মিসকিন : একজন দরিদ্র ভদ্রলোককে বুঝায়, যার বাহ্যিক অবস্থা দেখেও অভাবগ্রস্ত মনে হয় না, স্বীয় আত্মসম্মান বোধের জন্য অপরের নিকট সাহায্য চাইতে পারে না অথচ কঠোর শ্রম ও প্রাণান্তর চেষ্টার পরও সংসারের অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে না। সমাজে তথা নিজ আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে এরকম কেউ থাকলে তারাই হকদার বেশি।

৩. যাকাত আদায়কারী কর্মচারী : সরকারিভাবে নিযুক্ত যাকাত আদায় ও বিতরণের কর্মচারী। বর্তমানে এই খাত বাংলাদেশে প্রযোজ্য নয়।

৪. মন জয় করার জন্য/নওমুসলিম : যাদের অন্তর ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট তবে সামাজিক বা আর্থিক ভয়ে ইসলাম ধর্মে আসছে না তাদের সাহায্য করে প্রকাশ্যে দলভুক্তি করা অথবা যারা নওমুসলিম হয়েছে অন্য ধর্ম ছাড়ার কারণে পারিবারিক সামাজিক ও আর্থিকভাবে বঞ্চিত হয়েছে তাদের সাহায্য করে ইসলামে সুদৃঢ় করা। যেমন, সফওয়া ইবনু উমাইয়াকে হুনাইন যুদ্ধের গনিমত দিয়েছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু সুফিয়ান ইবনু হারবকে, আক্বা ইবনু হাবেসক এবং উয়াইনাহ ইবনু মিহসানকে যাকাত দিয়েছিলেন। 

৫. ঋণমুক্তির জন্য : জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য সঙ্গত কারণে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের ঋণমুক্তির জন্য যাকাত প্রদান করা যায়। সেসব গরিব যারা ঋণ করেছে এবং শোধ করার সামর্থ্য নেই তাদের যাকাতের টাকা দিয়ে সাহায্য করা যাবে। 

বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ ঋণ খেলাফি ধনী এর আওতায় আসবে না যারা ব্যাংক থেকে টাকা ধার নিয়ে শোধ করতে পারছে না। তাদের ওই ঋণ জীবন বাঁচানোর তাগিদে নেওয়া হয়নি। বরং তা নেওয়া হয়েছিল নিজেদের বিলাসিতাকে পরিপূর্ণ করার মানসে।

৬. দাসমুক্তি : কৃতদাস মুক্তির জন্য—এ-প্রথা এখন প্রযোজ্য নয়।

৭. ফি সাবিলিল্লাহ বা আল্লাহর পথে : সাবিলিল্লাহ শব্দের অর্থ ব্যাপক। যেসব কাজ দ্বারা আল্লাহর সন্তোষ ও নৈকট্য লাভ করা যায় তাকেই ফি-সাবিলিল্লাহ্ বুঝায়। অন্যকথায় মুসলিম জনগণের কল্যাণকর যাবতীয় কাজ যার ফলে দীন ও রাষ্ট্রের স্থিতি আসে এমন কাজ। যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে। বর্তমানে জিহাদের অপব্যাখ্যা করা হচ্ছে। কাজেই এটি একটি বিতর্কিত বিষয়। এতিমখানায় দেওয়া যেতে পারে যেখানে গরিব বাচ্চারা লেখাপড়া করে। তবে প্রাপ্ত যাকাত বা ফিতরার টাকা থেকে শিক্ষকদের বেতনভাতা দেওয়া যাবে না। 

৮. মুসাফির/প্রবাসী : পথে বা প্রবাসে মুসাফির অবস্থায় কোনো ব্যক্তি বিশেষ কারণে অভাবগ্রস্ত হলে ওই ব্যক্তির বাড়িতে যতই ধন-সম্পদ থাকুক না কেন তাকে যাকাত প্রদান করা যাবে। 

যাকাত কাকে দেওয়া যাবে না 

১. নেসাব পরিমাণ মালের অধিকারী বা ধনীকে যাকাত দেওয়া যাবে না (মুসাফির ব্যতীত)। যে ব্যক্তির কাছে যাকাতযোগ্য সম্পদ নেসাব পরিমাণ নেই কিন্তু অন্য ধরনের সম্পদ, যাতে যাকাত আসে না। যেমন ঘরের আসবাবপত্র, পরিধেয় বস্ত্র, জুতা ইত্যাদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত ও নিসাবের সমমূল্য পরিমাণ আছে, তাকে যাকাত দেওয়া যাবে না। 

২. যাকাতের টাকা কোনো জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা যাবে না। ব্যয় করা হলে যাকাত আদায় হবে না। যেমন, রাস্তাঘাট, পুল নির্মাণ করা, কূপ খনন করা, বিদ্যুৎ-পানি ইত্যাদির ব্যবস্থা করা। কেননা শরীয়তে যাকাতের বিধান দেওয়া হয়েছে ব্যক্তির প্রয়োজন পূরণের জন্য; সামাজিক প্রয়োজন পূরণের জন্য নয়। যাকাতের টাকা দ্বারা মসজিদ-মাদরাসার বিল্ডিং নির্মাণ করা, ইসলাম প্রচারের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যয় করা, ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন-ভাতা দেওয়া, ওয়াজ-মাহফিলের জন্য ব্যয় করা বা এগুলোতে সহায়তা দেওয়া, মিডিয়া তথা রেডিও, টিভি চ্যানেল করা জায়েয নয়; বরং যাকাতের টাকা তার হকদারকেই মালিক বানিয়ে দিতে হবে। অন্য কোনো ভালো খাতে ব্যয় করলেও যাকাত আদায় হবে না। 

৩. নিজের বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, পরদাদা প্রমুখ ব্যক্তিÑ যারা তার জন্মের উৎস তাদের নিজের যাকাত দেওয়া জায়েয নয়। এভাবে নিজের ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনী এবং তাদের অধস্তনকে নিজ সম্পদের যাকাত দেওয়া জায়েয নয়। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে যাকাত দেওয়া জায়েয নয়। 

৪. সম্পদশালীর নাবালক পুত্র-কন্যাকে যাকাত দেওয়া যাবে না। 

৫. কুরাইশ গোত্রের বনু-হাশেমের অন্তর্গত আব্বাস, জাফর, আকীল (রাযি.)-এর বংশধরের জন্য যাকাত গ্রহণ বৈধ নয়। 

৬. অমুসলিম ব্যক্তিকে যাকাত দেওয়া যাবে না। 

৭. যেসব প্রতিষ্ঠানে ধনী-গরিব সবাই সেবা পায় সেখানে যাকাত দেওয়া যাবে না। যেমন : মসজিদ, মাদরাসা (এতিম ফান্ড বা লিল্লাহ বোডিং ব্যতীত), শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আশ্রয়কেন্দ্র, সেতু, টিউবয়েল, কূপ, পুকুর, রাস্তাঘাট ইত্যাদি।

৮. দরিদ্র পিতামাতা, সন্তান, দাদা, নানা, স্বামী বা স্ত্রীকে যাকাত দেওয়া যাবে না।  

৯. প্রতিষ্ঠানের বেতনভুক্ত কর্মচারী প্রতিষ্ঠানের এতিমখানা/লিল্লাহ বোডিং এর জন্য যাকাত আদায়কারী নিযুক্ত হলে তাকে ব্যক্তিগতভাবে কিছু হাদিয়া/উপঢৌকন হিসাবে দেওয়া যাবে না।  

১০. নিজ চাকর চাকরাণীকে যাকাতের টাকায় বেতন-ভাতা দেওয়া যাবে না। 

সম্পর্কিত খবর

About Us

NRBC is an open news and tele video entertainment platform for non-residential Bengali network across the globe with no-business vision just to deliver news to the Bengali community.