এনআরবি লাইফ

সদকাতুল ফিতরের পরিচয় ও আদায় পদ্ধতি

post-img

পবিত্র রমযান মাসে বিশেষ কিছু আমল রয়েছে। সদকাতুল ফিতর একটি অন্যতম ইবাদত। ঈদের দিন গরিবদের খাবারের জন্য শরীয়ত প্রদত্ত একটি ব্যবস্থাপত্র এই ফিতরা। সদকাতুল ফিতর সম্পর্কে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা এ দিনটিতে তাদেরকে অন্যের কাছে চাওয়া থেকে বিরত রাখো’। যাকাতের মতো এটিও দরিদ্র মানুষের ওপর মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত আমলী সহযোগিতা। ইসলামী শরীয়তের হুকুম মোতাবেক ঈদের দিনের ফজরের নামাযের আগে পর্যন্ত যে সন্তান জন্মগ্রহণ করবে তারও ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব।

ফিতরা কী?

ফিতরা বা ফেতরা আরবী শব্দ, যা ইসলামে যাকাতুল ফিতর (ফিতরের যাকাত) বা সাদাকাতুল ফিতর (ফিতরের সদকা) নামে পরিচিত। ফিতর বা ফাতুর বলতে খাদ্যদ্রব্য বোঝানো হয়, যা দ্বারা রোযাদাররা রোযা ভঙ্গ করেন। ইসলামী শরীয়তের হুকুম মোতাবেক এটি একটি ওয়াজিব আমল। ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় পর্যন্ত জীবিকা নির্বাহের অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রী ছাড়া নেসাব পরিমাণ বা অন্য কোনো পরিমাণ সম্পদের মালিকদের পক্ষ থেকে গরিবদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণের একটি অর্থ প্রদান করার বিশেষ আয়োজনকে সদকাতুল ফিতর বলা হয়। জনপ্রতি আধা সা অর্থাৎ এক সের চৌদ্দ ছটাক বা পৌনে দুই সের গম বা সমপরিমাণ গমের মূল্য ফিতরা হিসেবে প্রদান করতে হবে। 

ফিতরার পরিমাণ

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মোট চারটি পণ্য দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায় করা হত, খেজুর, কিশমিশ, জব ও পনির। হযরত আবু সাঈদ খুদরি (রাযি.) বলেন, অর্থ : আমাদের সময় ঈদের দিন এক সা খাদ্য দ্বারা সদকা আদায় করতাম। আর তখন আমাদের খাদ্য ছিল জব, কিশমিশ, পনির ও খেজুর।  

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে গমের ভালো ফলন ছিল না বিধায় আলোচিত চারটি পণ্য দ্বারাই ফিতরা আদায় করা হত। এরপর হযরত মুয়াবিয়ার (রাযি.) যুগে গমের ফলন বেড়ে যাওয়ায় গমকে আলোচিত চারটি পণ্যের সঙ্গে সংযোজন করা হয়। আর তখন গমের দাম ছিল বাকি চারটি পণ্যের তুলনায় বেশি। আর মূলত এই দাম বেশি থাকার কারণেই হযরত মুয়াবিয়া গমকে ফিতরার পণ্যের তালিকভুক্ত করেছিলেন। অতএব, গম দ্বারা আদায় করলে আধা সা বা এক কেজি ৬২৮ গ্রাম দিলেই ফিতরা আদায় হয়ে যাবে। আর বাকি চারটি পণ্য অর্থাৎ খেজুর, জব, পনির ও কিশমিশ দ্বারা আদায় করার ক্ষেত্রে জনপ্রতি এক সা বা তিন কেজি ২৫৬ গ্রাম দিতে হবে।

গম ছাড়া অন্য পণ্য দ্বারা ফিতরা আদায় করলে এক সা পরিমাণ দিতে হচ্ছে, যা গমের ওজনের দ্বিগুণ এবং মূল্যের দিক দিয়েও অনেক তফাত। হাদীসে এক সা আদায় করার কথা উল্লেখ থাকার পরও তখন গমের মূল্য অনেক বেশি হওয়ায় সাহাবারা আধা সা পরিমাণ গম আদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাহলে এখন প্রশ্ন হলো, অন্য চারটি পণ্য হিসাব না করে শুধু গমের পরিমাণ হিসেবে ফিতরা আদায় করা যৌক্তিক হচ্ছে তো? হাদীসের আলোচনা থেকে এ কথাটি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, সাহাবারা খেজুর, জব, পনির ও কিশমিশ থেকে হলে এক সা পরিমাণ এবং গম থেকে হলে আধা সা পরিমাণ ফিতরা আদায় করতেন। কারণ তখন গমের দাম অন্যসব পণ্যের তুলনায় বেশি ছিল। আর বর্তমানে অন্য চারটি পণ্যের তুলনায় গমের দাম কম। এ পর্যন্ত হাদীসের এমন কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি যে সাহাবারা সবাই সর্বনি¤œ দামের বস্তু দ্বারা ফিতরা আদায় করেছেন। বরং তাদের সবার আগ্রহ ছিল সর্বাধিক দামি পণ্য দ্বারা ফিতরা আদায় করা। তাহলে বর্তমানে সবাই সর্বনি¤œ দামের পণ্য দ্বারা ফিতরা আদায় করছে কেন? বেশি সম্পদশালী এবং কম সম্পদশালী নির্বিশেষে গম বা সর্বনি¤œ দামের পণ্য দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায় করার বিষয়টি বিবেকবর্জিত এবং হাদীস ও শরীয়তের নির্দেশনার পরিপন্থি। সবার উচিত সামর্থ্য অনুযায়ী সদকাতুল ফিতর আদায় করা এবং দায়সারা আদায় পদ্ধতি ত্যাগ করা।

যার সামর্থ্য আছে উন্নতমানের খেজুর দ্বারা সে খেজুর দ্বারাই আদায় করবে। আর যার সামর্থ্য আছে কিশমিশ কিংবা জব দ্বারা আদায় করার সে তা দ্বারা আদায় করবে। যার গম দ্বারা আদায় করা ছাড়া অন্য পণ্য দ্বারা আদায় করার সামর্থ্য নেই সে গম দ্বারা ফিতরা আদায় করবে। বেশি সম্পদশালী এবং কম সম্পদশালী নির্বিশেষ গম বা সর্বনিম্ন দামের পণ্য দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায় করার বিষয়টি বিবেকবর্জিত এবং শরীয়তের নির্দেশনার পরিপন্থি।  

ফিতরা কারা দেবেন?

নারী-পুরুষ, স্বাধীন-পরাধীন, শিশু-বৃদ্ধ, ছোট-বড় সব মুসলিমের জন্য ফিতরা প্রদান করা ওয়াজিব। 

ইবনে উমর (রাযি.) থেকে জানা যায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক স্বাধীন-ক্রীতদাস, নারী-পুরুষ, ছোট-বড় মুসলমানের যাকাতুল ফিতর এক ‘সা’ পরিমাণ খেজুর বা যব ফরজ করেছেন।  

তিনি লোকদের ঈদের নামাযে বের হওয়ার পূর্বেই তা আদায় করার আদেশ দিয়েছেন। ফিতরা দেওয়ার সামর্থ্য আছে (এক দিন ও এক রাতের খাদ্যের অতিরিক্ত পরিমাণ সম্পদ থাকলে) এ রকম প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিজের ও পরিবারের সব সদস্যের পক্ষ থেকে ফিতরা প্রদান করা ফরজ, যাদের লালন-পালনের দায়িত্ব শরীয়ত কর্তৃক তার উপরে অর্পিত হয়েছে। যার নিকট এক দুই বেলার খাবার ব্যতীত অন্য কিছু নেই তার ফিতরা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।  

কে ফিতরা পাবে?

গরিব, দুস্থ, অসহায়, অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিরাই ফিতরার দাবিদার। তবে যার জন্য যাকাত খাওয়া জায়েয এবং যার ওপর যাকাত ওয়াজিব নয়, এমন ব্যক্তিকে ফিতরা প্রদান করা যাবে।  

কাজের লোকের ফিতরা দেওয়া

বেতনভুক্ত কাজের ব্যক্তির পক্ষে ফিতরা প্রদান করা মালিকের ওপর আবশ্যক নয়। তবে মালিক ইচ্ছা করলে কাজের লোককে ফিতরা প্রদান করতে পারবেন। তবে তিনি বেতন বা পারিশ্রমিক হিসাবে ফিতরা প্রদান করতে পারবেন না। 

যা দিয়ে ফিতরা দেওয়া যাবে 

আবু সাঈদ খুদরি (রাযি.) বলেন, 

অর্থ : আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে যাকাতুল ফিতর দান করতাম এক সা খাদ্যদ্রব্য কিংবা এক সা যব কিংবা এক সা খেজুর কিংবা এক সা পনির কিংবা এক সা কিশমিশ।  

এই হাদীসে খেজুর ও যব ছাড়া আরো যে কয়েকটি বস্তুর নাম পাওয়া গেল তা হলো, কিশমিশ, পনির এবং খাদ্যদ্রব্য। উল্লেখ থাকে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিগত হওয়ার পর মুয়াবিয়া (রাযি.)-এর খেলাফতে অনেকে গম দ্বারাও ফিতরা দিতেন।  

খাদ্যদ্রব্য দিয়ে ফিতরা দেওয়া

সাহাবী আবু সাঈদ খুদরি বর্ণিত হাদীস থেকে জানা যায়, খাদ্যদ্রব্য দিয়ে ফিতরা প্রদানের কথা। যেহেতু চাল বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের প্রধান খাদ্য সেহেতু চাল দিয়েও ফিতরা প্রদান করা যাবে। চালের বদলে ধান দিয়ে ফিতরা দিতে হলে ওজনের ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে। কারণ এক সা ধান এক সা চালের সমমূল্যের হবে না। কোরআন থেকে জানা যায়, 

অর্থ : তোমরা খাদ্যের খবিস (নিকৃষ্ট) অংশ আল্লাহর পথে খরচ করার সঙ্কল্প করো না। কেননা, তোমরা স্বয়ং তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত নও।  

তবে ধানের থেকে চাল দিয়ে ফিতরা প্রদান করা উত্তম। নিম্নোক্ত কিয়াস থেকে এই ব্যাপারে ধারণা পাওয়া যায়, যবের ওপর কিয়াস (অনুমান) খাটিয়ে ধানের ফিতরা জায়েয হবে না। কারণ ধান আদৌ আহার্য সামগ্রী ‘তাআম’ নয়। আহার্য বস্তুর ওপর কিয়াস করে যব বা খুরমার ফিতরা দেওয়া হয় না, মনসূস (কোরআন বা হাদীসে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত) বলে দেওয়া হয়ে থাকে। তাআম বা আহার্য সামগ্রীরূপে ফিতরা দিতে হলে এক সা চাল দিতে হবে। 

টাকা দিয়ে ফিতরা দেওয়া

নবীজীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুগে মুদ্রা হিসেবে দিরহাম প্রচলিত ছিল। দিরহামের দ্বারা কেনাকাটা, দান খয়রাত করা হত। 

তবু খুদরি বর্ণিত হাদীস থেকে জানা যায়, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদ্যবস্তু দিয়ে ফিতরা প্রদান করতেন। এ জন্য ইসলামবেত্তাদের বড় অংশ টাকা দিয়ে ফিতরা প্রদানের ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেন। 

ইমাম আহমদ (রহ.) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতের বরখেলাফ হওয়ার কারণে আমার আশংকা হচ্ছে যে, তা যথেষ্ট হবে না। তবে প্রয়োজনে টাকা দিয়েও ফিতরা আদায় করা বৈধ। বাংলাদেশের মুসলিমরা টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করতে চাইলে ২:৪০ (দুই কেজি চল্লিশ গ্রাম) মধ্যমানের চালের মূল্য দিতে হবে। 

সা ও অর্ধ সা-এর বিবরণ

ফিতরা প্রদানের পরিমাপ সংক্রান্ত আলোচনায় সা বহুল আলোচিত শব্দ। সা হচ্ছে আরব দেশে ওজন বা পরিমাপে ব্যবহƒত পাত্র। বাংলাদেশে যেমন ধান পরিমাপের জন্য একসময় কাঠা ব্যবহƒত হত। একজন মাঝামাঝি শারীরিক গঠনের মানুষ অর্থাৎ অধিক লম্বা নয় এবং খাটোও নয়, এই রকম মানুষ তার দুই হাত একত্রে করলে যে অঞ্জলি গঠিত হয়, ওই রকম পূর্ণ চার অঞ্জলি সমান হচ্ছে এক সা। হাদীস থেকে সুস্পষ্ট জানা যায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সা পরিমাণ ফিতরা প্রদানের কথা। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং চার খলীফার মৃত্যুর পর মুয়াবিয়া (রাযি.) ইসলামী রাষ্ট্রের খলীফা নির্বাচিত হন এবং ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানী মদীনা থেকে দামেস্ক স্থানান্তরিত করেন, তখন তারা গমের সঙ্গে পরিচিত হন। সেকালে সিরিয়ার গমের মূল্য খেজুরের দ্বিগুণ ছিল। তাই খলীফা মুয়াবিয়া একদা হজ বা উমরা করার সময় মদীনায় এলে মিম্বরে বলেন : আমি অর্ধ সা গমকে এক সা খেজুরের সমতুল্য মনে করি। লোকেরা তার এই কথা মেনে নেয়। এরপর থেকে মুসলিম জনগণের মধ্যে অর্ধ সা ফিতরার প্রচলন শুরু হয়। 

সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ সবার জন্য সমান?

বড়ই পরিতাপের ব্যাপার! পুরো দেশের সব শ্রেণির লোক বছর বছর ধরে সর্বনিম্ন মূল্যের হিসেবে ফিতরা আদায় করে আসছে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সকলেই ফিতরা দিচ্ছে একই হিসাবে জনপ্রতি ৬০/৭০ টাকা করে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় সকলে ভুলেই গেছে গম হচ্ছে ফিতরার পাঁচটি দ্রব্যের একটি—যা সর্বনিম্ন মূল্যের।

উত্তম হলো, নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী বেশি মূল্যের খাদ্যবস্তুকে মাপকাঠি ধরে ফিতরা আদায় করা। কেননা সদকার মূল লক্ষ্যই হলো গরিবদের প্রয়োজন পূরণ ও তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ। এ ছাড়া আদায়কারীর সামর্থ্যকেও বিবেচনায় রাখা উচিত। কেননা কেউ এক হাজার টাকা মূল্যের খেজুর খেতে অভ্যস্ত হয়ে যদি পচিশ/ত্রিশ টাকা মূল্যের গমের হিসেবে ফিতরা দেন—তবে তা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? সে প্রশ্ন বিবেকের কাছে থেকেই যায়।

আরও পড়ুন

- লাইলাতুল কদর ও এ রাতের করণীয়?

- যাকাত কাকে দিবেন এবং কাকে দিতে পারবেন না

- যাকাত না দেওয়ার পরিণাম ও শাস্তি

সম্পর্কিত খবর

About Us

NRBC is an open news and tele video entertainment platform for non-residential Bengali network across the globe with no-business vision just to deliver news to the Bengali community.