বিনোদন

ওরা বাংলায় গান গায়, বাংলা গানে নাচে, ওরা বাংলা স্কুলে পড়ে

post-img

ওরা বাংলায় গান গায়... ওরা বাংলার গান গায়। ওরা নিজেকে বাংলায় খুঁজে পায়। ওরা হয়তো বাংলার মায়া ভরা পথে হাঁটেনি কখনো.. কিন্তু ওরা বাংলাকে ভালোবাসে। বাংলার হাত ধরে মানুষের কাছে আসে। কারণ ওরা বাংলা স্কুলে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়াস্থ ফলসচার্জ এলাকায় শনিবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যায় এই বাংলাপ্রেমি, বাংলাপাঠী একগুচ্ছ শিশু-কিশোর-কিশোরীর মেলা বসেছিলো এখানকার জেমস লি কমিউনিটি সেন্টারে।

এই শিশু-কিশোররা সকলেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি নতুন প্রজন্ম। এদের কেউ হয়তো প্রবাসে তৃতীয় প্রজন্মের, কেউ দ্বিতীয়। নিয়মিত স্কুলে ওদের বাংলা শেখার সুযোগ নেই। সাধারণ কথা যখন বলে তখন বোঝা যায় ওদের ভাষাটাই ইংরেজি। তারপরেও ওরা বাংলাকে ভালোবাসে। আর তাই ওরা বাংলাস্কুলে পড়ে।


সেই পাঠে তাদের আত্মনিয়োজন আছে। আছে ভালোবাসা। তারই স্বীকৃতি দিতে জেমস লি সেন্টারের মিলনায়তনে ওদের পুরষ্কৃত করা হলো। তুলে দেওয়া হলো উপহার। অনুষ্ঠানের নামটাই ছিলো- বাংলাস্কুল আয়োজিত ৩০তম উপহার বাংলাদেশ মেলা।

শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হলো সনদ। তাদের গলায় পরিয়ে দেওয়া হলো মেডাল। এদের মধ্যে কেউ কেউ ছিলো সেরাদেরও সেরা। তারা ভূষিত হলো বিশেষ পুরষ্কারে।

তবে উপহার নিতে এসে সবচেয়ে বড় উপহার যেনো দিয়ে গেলো এই শিশু-কিশোর-কিশোরীরাই। তারা গাইলো। তারা নাচলো। শোনালো কবিতা। বাংলা গানের সুরে সুরে তারা ভরে তুললো মিলনায়তন। নৃত্যতালে তারা মুগ্ধ করলো দর্শকদের।

মিলনায়তন দর্শকে ছিলো কানায় কানায় পূর্ণ। তারা উপভোগ করছিলেন এই শিশু-কিশোরদের একের পর এক দারুণ সব উপস্থাপনা।


স্কুলের শিক্ষক আর স্কুল বোর্ডের পরিচালকরা এই অনুষ্ঠানটিকে নিয়ে যে ছিলেন কতটা আন্তরিক তা এর গোছানো পরিবেশনা থেকেই আন্দাজ করা গেলো। তবে শিক্ষকরা বিশেষ করে স্কুলে মিউজিক একাডেমির নাচ ও গানের শিক্ষকরা যেনো তাদের সবটুকু ঢেলে দিয়ে তৈরি করেছিলেন ওদের।

বিশেষ করে যখন একসঙ্গে এক তালে শিশুরা গাইলো সমবেত কণ্ঠে বাংলার দুই প্রধান কবির দুই গান... ববি ঠাকুরের- ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা আর কাজী নজরুলের ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি আমার দেশের মাটি।

দেশের জন্য এই দুই গানের এমন সুমিশ্রিত পরিবেশনা আর কেউ কি শুনেছে কখনো?

পরে শিশুরা সমবেত ভাবে গাইলো আরেকটি গান- তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে। তাতে কেউ গাইলো কেউ কণ্ঠ মেলালো, কেউ বা হাত দুলিয়ে দিলো তাল।


একজন কবিতা পড়ে শোনালো যা লেখা হয়েছিলো এই স্কুল আর এই উপহার আয়োজন নিয়েই।

মাঝে একবার পরিচিতি পর্ব হয়ে গেলো স্কুল বোর্ডের পরিচালকদের। তবে মূল পরিবেশনা তখনো বাকি।

ষড়ঋতুতে আবর্তিত প্রিয়দর্শিনী জননী আমার গীতিনৃত্যাল্লেখ্য এই শিরোনামে যে উপস্থাপনাটি হয়ে গেলো তা দর্শকদের যেনো ভাসিযে নিয়ে গেলো তাদের প্রিয় জন্মভুমি বাংলাদেশে। বাংলার ষড়ঋতুকেই তারা দেখতে পেলেন নাচের মুদ্রায়... শুনতে পেলেন গানে ও কথায়। তবে পুরোটাই ঋতু সৈন্দর্যের কবি রবীন্দ্রনাথে ভর করে।

দারুণ এক গ্রীস্মবন্দনায় নৃত্যে শিক্ষক ও স্বনামধন্য শিল্পী রোজমেরি মিতু রোজারিও নেচে গেলেন মঞ্চে আর শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানালেন গ্রীস্মের গান দারুণ অগ্নিবানেরে হৃদয়ে তৃষা হানেরে... এই গানের ঝংকারে নাচার জন্য।

আর বর্ষার আবাহনী নৃত্যে প্রকৃতিতে নতুন প্রাণ জাগা এক মওসুম এই বর্ষাকে উপস্থাপন করলেন রোজমেরী। সেই বর্ণনা নৃত্যের পর মেয়েরা এসে নাচলো ময়ুরের পেখম খুলে- নাচ ময়ুরী নাচ রে পেখম খুলে নাচরে এই গানে।

শরতকে ডাকা হলো শিউলি সৌন্দর্য্যের জপে। শিক্ষক রোকেয়া জাহান হাসি তার অনন্য নাচের মুদ্রায় মঞ্চ রাঙিয়ে শিক্ষার্থীদের ডেকে নিলেন। আর সেই রবি ঠাকুরের গান দেখো দেখো দেখো শুকতারা আঁখি মেলে চায় প্রভাতের কিনারায়...বাদ্যগানে মেয়েরা মঞ্চকে ভরে তুললো তাদের নাচের কিন্নরিতে।

হেমন্তের আবাহনে তারা দেখালো নাচ মেঠোসুরের বিপরীতে সেই অনন্য গান আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরির খেলা। শিক্ষক রোজমেরি রোজারিও নেচে গেলেন কথায় আরা মেয়েরা মঞ্চে এসে যেনো তারাই নীল আকাশে ভাসিয়ে দিলো সাদা মেঘের ভেলা।

প্রকৃতিতে শীতল পরশ নিয়ে আসা পৌষের বর্ণণায় এলো নবান্নের কথা। পিঠে পায়েসের কথা। সেসব কথামালায় নাচলেন শিক্ষিকা রোকেয়া জাহান হাসি। তার আহ্বানে মঞ্চে মাতিয়ে বাংলা স্কুলের মেয়েরা সব নাচলো পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে আয় আয় আয়... গানে।

এরপর ঋতুরাজ। শিক্ষক রোজমেরি বসন্ত আবাহন শেষ করলেন কথামালার বিপরীতে নেচে। আর মেয়েরা নাচলো কিছু স্বপ্ন, কিছু মেঘলা, কিছু বই টই ধুলো লাগা কিছু ইচ্ছে, সাড়া দিচ্ছে এ বসন্ত রাত জাগা... এই গানে

ওদের নাচের মুদ্রায় আর কিন্নরিতে মঞ্চ মাতলো, মাতলো দর্শকও।


এমন একটা অনন্য পরিবেশনায় দর্শকের স্ট্যান্ডিং ওভেশন থাকবে সে কথা বলার অপেক্ষাই রাখে না। হলোও তাই। করতালিতে মঞ্চ কাঁপলো কাঁপলো মিলনায়তন।

এই শিশুদের উৎসাহ দর্শকরা যেমন দিচ্ছিলেন তেমনি বাংলাস্কুলের কর্তৃপক্ষের মুখেও শোনা গেলো গর্বের সব উচ্চারণ। এই শিশুদের কথা বলছিলেন স্কুল পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি শামীম চৌধুরী। তিনি বলছিলেন কেনো তারা বাংলা স্কুলে শিশুদের নিয়মিত শিক্ষার পাশাপাশি নাচ ও গান শেখান।

এরপরে একটি একক নৃত্য হয়ে গেলো মরিয়ম ইসলামের। বাংলাস্কুলের প্রাক্তন। এখন যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় নৃত্যশিল্পী। সে নেচে দেখালো বাঁশি কেনো গায় আমারে কাঁদায় এই গানে।

এরপর কিছু সম্মাননা দেওয়ার পালা চললো। সম্মানিত করা হলো বাংলাস্কুলের আজীবন সদস্যপদ পাওয়া কয়েকজনকে।

তবে শিশুদের গান তখনও বাকি। এরপর কিছু ক্লাসিক্যাল ও আধুনিক গানের পরিবেশনা হলো। এভাবে কয়েকটি পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শেষ হলো বাংলাস্কুলের এই উপহার। একটি অনন্য সন্ধ্যা কাটালেন ভার্জিনিয়া-ডিসি মেরিল্যান্ডে বসবাসকারী বাংলাদেশি কমিউনিটির মানুষগুলো। নিশ্চয়ই তারা থাকবেন বছর পার করে আরেকটি উপহার কবে আসবে তার অপেক্ষায়।

সম্পর্কিত খবর

About Us

NRBC is an open news and tele video entertainment platform for non-residential Bengali network across the globe with no-business vision just to deliver news to the Bengali community.