অমর একুশের এই গানটির রচয়িতা আবদুল গাফফার চৌধুরী। ৫২’র ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে, তরুণ বয়সে লেখা এই গানটির জন্যই তিনি বাংলাদেশের মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হলেও বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে আবদুল গাফফার চৌধুরী সাহিত্যসহ নানামাত্রিক প্রতিভায় নিজেকে বিকশিত করেছিলেন।
আবদুল গাফফার চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৪ সালের ১২ ডিসেম্বর বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে। মা জোহরা খাতুন, বাবা ওয়াহেদ রেজা চৌধুরী ব্রিটিশ ভারতে অবিভক্ত বাংলার আইনসভার সদস্য ছিলেন। স্থানীয় পর্যায়ে স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে গাফফার চৌধুরী ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। পরবর্তীকালে তাঁর উচ্চশিক্ষা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পঞ্চাশের দশকে তিনি ঢাকায় কর্মজীবন শুরু করেন দৈনিক ইনসাফ পত্রিকায়। এরপর একে একে আবদুল গাফফার চৌধুরী কাজ করেছেন দৈনিক সংবাদ, মিল্লাত, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক আজাদ, দৈনিক পূর্বদেশসহ বিভিন্ন পত্রিকায়। তিনি মূলত খ্যাতি অর্জন করেন রাজনৈতিক কলাম লেখক হিসেবে। এসব কলামে ছিলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের বিস্তর বিবরণ।
দেশের জন্য সর্বদা সোচ্চার বলিষ্ঠ এক কলমযোদ্ধা ছিলেন আব্দুল গাফফার চৌধুরী। ৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে তাঁকে জীবনের নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করতে হয়। স্বাধীনতার পরবর্তীকালে, ১৯৭৪ সালে অক্টোবরে স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য সপরিবারে লন্ডনে চলে যান। সেখানে তিনি ‘নতুন দিন’ নামে একটি পত্রিকা বের করেন। ৭৫’এ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকাণ্ডের পর যখন দেশে খুব প্রতিকূল অবস্থা, তখন লন্ডনে আবদুল গাফফার চৌধুরী প্রবাসী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে প্রতিবাদ সংগঠিত করতে বড় ভূমিকা রাখেন। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে লন্ডন থেকে ‘বাংলার ডাক’ নামে পত্রিকা প্রকাশ করেন গাফফার চৌধুরী। পত্রিকাটিতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের মুখোশ উন্মোচন করা ও সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে সমালোচনা করেন। পরবর্তীতে লন্ডন থেকে তাঁর সম্পাদনায় ‘নতুন দিন, নতুন দেশ, পূর্বদেশ’ নামে সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এছাড়া লন্ডনের সাপ্তাহিক জনমতে নিয়মিত কলাম লিখতেন তিনি। গাফফার চৌধুরীর রাজনৈতিক কলাম ব্রিটেন বাংলাদেশ ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হতো। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ওপর ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’ নামে একটি চলচ্চিত্র তৈরি করেন আবদুল গাফফার চৌধুরী।
নানা কাজের স্বীকৃতি হিসেব অসংখ্য সন্মানায় ভূষিত হয়েছেন আবদুল গাফফার চৌধুরী। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য- বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, ইউনেস্কো সাহিত্য পুরস্কার এবং স্বাধীনতা পুরষ্কার। সাত দশকের বেশি সময় ধরে নিরন্তর লিখে যাওয়া আবদুল গাফফার চৌধুরীর কলম থেমে যায় ২০২২ সালের ১৯মে। সেদিন লন্ডনে, স্থানীয় সময় সকালে শেষ নিঃশাস ত্যাগ করেন খ্যাতিমান লেখক-সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী।
