এনআরবি বিশ্ব

সাড়ে সাত হাজার মাইল দূরে , তবু হৃদয় জুড়ে বাংলাদেশ!

post-img

লেখক: ফারহানা হানিপ

আর আট দশটা সাধারন মেয়ের মত বেড়ে ওঠা আমার। অস্তিত্ত্বের মাঝে একাত্তর একটা আলাদা জায়গা নিয়ে ছিল আমার চিরদিন। আমাকে ছোটবেলায় সবাই ফারহা নামে ডাকতো। ফারহা থেকে ফারহানা হানিপ, এতগুলো বছরের পথচলা আমাকে একদিনের জন্যও দেশ কিংবা দেশের মাটি থেকে আলাদা করতে পারেনি। বরং প্রতিটি মুহূর্তে আমি অনুভব করেছি মাটি, মা আর একাত্তরকে। আমার কাছে বাঙালীয়ানা শব্দটার পূর্নতা বঙ্গবন্ধুর বজ্রকন্ঠের ৭ই মার্চের ভাষনে আর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটা একটুকরো বাংলাদেশ। আমি সবসময় চাইতাম আমার সন্তান যেন ঠিক আমার মত করেই দেশ, মাটি, একাত্তর, বঙ্গবন্ধুকে আপন করে নেয় হৃদয়ের অন্ত:স্তলে।

লেখালেখি আমি তেমন একটা করিনা। সারাদিন কাজের ব্যস্ততায় আর সংসার সামলে ঠিক হয়েও ওঠেনা। কিন্তু মার্চ মাস এলেই কেমন জানি লাগতে থাকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা হয়েছিল এই মার্চ মাসেই। দেশাত্মবোধক গানগুলো শুনে আজও আমার রোমকূপ দাঁড়িয়ে যায়। ‘৭১ এ আমার জন্ম হয় নি, কিন্তু বাবা-মার কাছে অনেক শুনেছি সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা। অনেকের মতই জীবন সংগ্রামে আজ বসতি গড়েছি বিদেশের মাটিতে, কিন্তু শিকড়টা ঠিকই পড়ে আছে আমার মাতৃভূমি, বাংলাদেশে।তাই দেশকে নিয়ে কিছু লেখার সুযোগ পেয়ে লোভ সামলাতে পারলাম না। 

আমার তিন মেয়ে। নাফিসা, প্রিয়েতা আর ইলাফ। ছোট মেয়েটা তখন খুবই ছোট। গত বছর গ্রীষ্মের ছুটিতে মেয়েদের নিয়ে গিয়েছিলাম বাংলাদেশে বেড়াতে। উদ্দেশ্য ছিল পরিবারের সাথে ঈদ করা আর বিদেশে যে জিনিসটা খুব মিস করি; মেয়েদের সাথে বাংলাদেশের ইতিহাস আর সংস্কৃতির সংযোগ তৈরি করে দেয়া। মাত্র কয়েক সপ্তাহর ছুটি। কিন্তু শত ব্যস্ততার মধ্যেও এবার চেয়েছিলাম মেয়েদেরকে কিছু হলেও ঢাকা শহর ঘুরিয়ে দেখাব। লিস্ট করলাম কোথায় কোথায় যাওয়া যায়; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্মৃতি জাদুঘর, লালবাগের কেল্লা, আহসান মঞ্জিল ইত্যাদি ইত্যাদি।ঢাকায়পৌঁছানোর পরই নানা কাজের ব্যাস্ততায় দেখতে দেখতে সময়টা শেষ হয়ে এলো! কিন্তু এবার না হলেই নয়... 

দিনটি ছিল আগস্ট মাসের ১৫ তারিখ। জাতীয় শোক দিবস আবার সরকারি ছুটির দিনও। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডে সপরিবারে প্রাণ হারান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান। ভাবছিলাম আজকের দিনটায় কি করা যায়। দেখতে দেখতে চলে যাবার সময় হয়ে গেলো, আর কিছুদিন পরেই আমেরিকায় ফিরতে হবে। ভাবলাম সময় নষ্ট না করে আজকের এই বিশেষ দিনটিকে স্মরণ করে রাখার জন্য সবচেয়ে ভাল হবে যদি ওদেরকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্মৃতি জাদুঘরটা ঘুরে আসা যায়। ওরাও জানলো মাতৃভূমি জন্মের ইতিহাস। কয়েকজন বন্ধুদেরকে ফোন দিলাম কিন্তু কাওকেই পেলাম না, সবাই পরিবার নিয়ে কোথাও না কোথাও ছুটি কাটাতে গিয়েছে। অতঃপর আমাদের যাত্রা ধানমণ্ডি৩২ নং এর ঐতিহাসিক বাড়ি। ড্রাইভার বেশ অবাক হয়ে বলল, আপা আজ তো সব বন্ধ- শপিং মল, দোকানপাট সব বন্ধ। আমি বললাম ধানমণ্ডি ৩২এ চল। গাড়িতে আমি, দুই মেয়ে আর আমার ভাগ্নে লিংকন। ঘুরতে বের হয়ে প্রথমে বাচ্চাদের আগ্রহ যমুনা ফিউচার পার্ক বা হাতিরঝিল ফ্লাইওভারে থাকলেও পরের ঘটনা ছিল একেবারে ভিন্নরকম!

কথা বলতে বলতে কখন যে গাড়ি পৌঁছে গেলো টেরই পাইনি। যদিও ধানমণ্ডি এলাকায় বেশ ট্রাফিক এ পড়তে হয়েছিল। কয়েক বছরে আশেপাশের পরিবেশ অনেক বদলে গেছে। ধানমন্ডির লেক সার্কাসে৩২ নম্বর রোডেই সেই স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটি। এখানেই স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি তাঁর জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সপরিবারে ছিলেন। এই বাড়ি থেকেই পাকিস্তানী সৈন্যরা তাকে অসংখ্যবার গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তিনি এখান থেকেই দেশ পরিচালনার কাজ করতেন। বাড়ির প্রতিটি জায়গায় বঙ্গবন্ধুর সেই সময়ের সব চিহ্নগুলোকে সেভাবেই রেখে দেয়া হয়েছে।১৯৯৪ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁদের ধানমণ্ডি ৩২ এর এই বাড়িটি বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের কাছে হস্তান্তর করেন। পরে ট্রাস্ট তাঁর স্মৃতি ধরে রাখার জন্য সেটাকে জাদুঘরে রূপান্তর করে আর সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয় ১৯৯৭ সালে। গেটে ঢুকতেই সিকিউরিটি চেকিং। ব্যাগ, মোবাইল, ক্যামেরা সব রেখে ঢুকতে হয়। মেয়েরা ছোট, তাই ক্যামেরা সাথে নেয়ার জন্য খুব বায়না ধরল, কিন্তু ওদেরকে না বললাম। বাসার নিচতলায় বঙ্গবন্ধুর অফিস রুম। গুলির আঘাতে সব ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। সব ঠিক সেভাবে সংরক্ষণ করা আছে। এছাড়া তার বিভিন্ন সময়ের স্মৃতিবিজড়িত ছবি দিয়ে জাদুঘরটি সাজানো হয়েছে। জাদুঘরটিতে গাইডের ব্যাবস্থাও আছে যিনি জাদুঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে এর ইতিহাসও বর্ণনা করলেন আমাদের কাছে। 

আমি বুঝতে পারলাম মেয়েরা তখন আগ্রহ পাচ্ছে। ওদের জন্য বাংলা, আর ইংরেজিতে বুঝিয়ে দিতে হচ্ছিল। কিন্তু ওদেরকে আমাদের দেশের ইতিহাস পড়ে শোনাতে আমার খুব ভাল লাগছিল। দোতলায় বঙ্গবন্ধুর বেডরুম। এতো বড় মাপের একজন মানুষ, কিন্তু তাঁর কী সাধারণ আটপৌরে জীবন। কোন বিলাসিতা নেই! 

বাড়ির ভেতরটা ছিল খুবই শান্ত, বিশেষ দিন হওয়াতে লোকজনের বেশ ভিড় ছিল। তবু আমি ওদেরকে পুরো বাড়ির সবগুলো ঘর ঘুরে দেখালাম। হায়নাদের গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল চারপাশের সব দেয়ালগুলো। সেই গুলিতে একতলার সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। পাশেই পড়ে থাকা তাঁর ভাঙা চশমা ও পছন্দের তামাকের পাইপটি আজও একিভাবে রাখা আছে। রিসেপশান, বেডরুমের সামনে, সিঁড়িতে, বাথরুমে সব জায়গায় নারকীয় পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে সপরিবারে হত্যা করে খুনিরা। বাচ্চারা প্রতিটি জিনিস খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিল, শুনছিল আর কাগজে নোট করছিল। একটা সময়ে হঠাত খেয়াল করলাম, বড় মেয়েটা খুব ইমোশনাল হয়ে পড়েছে। আমি বুঝতে পারলাম, কিন্তু কিছু বললাম না। সবশেষে গেলাম শেখ রাসেলের রুম এ। তার সেই ব্যবহৃত খেলনা বাই সাইকেল সব ওভাবেই পড়ে আছে। তখন নাফিসা আর চোখের পানি আটকে রাখতে পারল না। আমাকে জরিয়ে ধরে হাঁটছে, ছবি আর জিনিসের কাপশান পড়ছে আর তার চোখ দিয়ে পানি পড়েই যাচ্ছে। ঘুরতে ঘুরতে আমরা চলে গেলাম বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলের রুমের পাশের ছাঁদে। কেন জানি না, এমন এক মুহূর্তে বাইরে ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়ছিল। মনের অবস্থা আর পুরো পরিবেশের সাথে একদম মানিয়ে গিয়েছিল বৃষ্টিটা। অচেনা বাতাস আর একটা দীর্ঘশ্বাস। লিওন তখন আমাকে বলল, ফুপ্পি, আমার স্কুল এখানেই। আমরা এখানে আসে পাশে অনেক আসি। কিন্তু এই জাদুঘরে আগে আসা হয়নি। সত্যি, এখানে এসে আমাদের দেশ নিয়ে অনেক কিছু জানলাম। থ্যাঙ্ক ইউ।

বাংলাদেশ আমার মাতৃভূমি। আমার সন্তানদের জানাতে চাই ওদের মাতৃভূমি সম্পর্কে, কিভাবে জন্ম হল, কিভাবে স্বাধীন হল, কাদের অবদানের জন্য আমরা আজ বাংলায় কথা বলতে পাড়ি, আমার দেশের ইতিহাস অবশ্যই জানা উচিত। 

মার্চ মাস আমাদের স্বাধীনতার মাস। ৯ মাস সংগ্রাম, আন্দোলন এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগে আমরা যে স্বাধীন দেশ পেয়েছি, মাতৃভূমি এবং মাতৃভাষার জন্য এই আত্মত্যাগের উদাহরণ ইতিহাসে বিরল। আত্মদানকারী শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনকরে বলতে চাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন আমদের দেশ নিয়ে ভাবে, দেশের ইতিহাস জানে, দেশের জন্য কাজ করে। তাহলেই তারা খুশি হবেন। 


গ্রীষ্মের ঐ ছুটিতে মেয়েদের নিয়ে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে যাওয়া ছিল আমাদের জন্য সত্যিই সেরা সিদ্ধান্ত ও অভিজ্ঞতা। 


- ফারহানা হানিপ, ওয়াশিংটন প্রবাসী।

সম্পর্কিত খবর

About Us

NRBC is an open news and tele video entertainment platform for non-residential Bengali network across the globe with no-business vision just to deliver news to the Bengali community.